... Our Guest Review ...



চোখের নোলা ,
শিবাখোলা ১
অঝোর বর্ষণে সিক্ত হয়ে , দার্জিলিং মেল এর কামরাগুলো যখন দেড় ঘন্টা দেরিতে Njp তে ঢুকলো , তখনও আকাশের মুখ ভার । ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি হয়েই চলেছে । আমরা সবাই চিন্তিত মুখে একে অপরের দিকে দেখতে লাগলাম । মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরতে আসাটা কি পুরো মাটি হয়ে যাবে ?
এই চিন্তার বোঝা মাথায় নিয়ে luggage টেনে বাইরে বেরোলাম । গাড়ী আগে থেকেই বলা ছিলো । শুরু হোলো শিবাখোলার উদ্যেশ্যে যাত্রা । মনে যতই আশঙ্কা থাক , একটা ব্যাপার কিন্তু অনবরত আমার মনের মতো ঘটে চলেছিলো । সেটা হোলো বর্ষার পাহাড় দেখা । হ্যাঁ , বর্ষার পাহাড় চিরকালই আমার favourite । সবুজে মেখে থাকা পাহাড়ের গা বেয়ে ঘন মেঘ বয়ে যাওয়ার, সম্মোহন আমি কোনোদিনই উপেক্ষা করতে পারিনি ।
Njp থেকে শালবাড়ির জঙ্গল হয়ে , toy train এর লাইন এর সাথে দৌড়াতে দৌড়াতে , আঁকা বাঁকা পথ বেয়ে , চড়াই উৎরাই পার করে , বৃষ্টি চিরে শিবাখোলা পৌঁছাতে প্রায় ঘন্টা দুয়েক লেগে গেলো ।
আগেই সঞ্জয় দার কাছে অসাধারণ কিছু ছবি দেখেছিলাম । কিন্তু যখন পৌঁছালাম তখন বুঝতে পারছিলাম না , কোনটা ছবি ? যেটা সঞ্জয় দা দেখিয়েছে , নাকি যেটা আমরা দেখছি ?????
বৃষ্টির জলে ভরে ওঠা এক পাহাড়ি নদী , তার একপাশে খান চল্লিশেক বাড়ির এক গ্রাম , আর এক পাশে পাহাড়ের পাদদেশে ছোট্ট একটা resort । যাওয়ার সাথে সাথে ছাতা নিয়ে ছুটে এসে আতিথেয়তার উদ্বোধন । ঘরগুলো ছিলো বিশাল বিশাল তাঁবুর , যার মধ্যে অতিপ্রয়োজনীয় সমস্ত ব্যবস্থায় বর্তমান । আর তাঁবুর উপরটা কাঠের কাঠামো দিয়ে ঢেকে সেটাকে ছোটো ছোটো resort এর আকার দেওয়া । সামনে নদীর ধরে বেশ কয়েকটা কাঠের তৈরী বেঞ্চ আর দুটো খড়ের ছাউনি দেওয়া বসার জায়গা । এই নদীটার নামই হোলো শিবাখোলা , চারটে পাহাড়ি নদী মিশে এর উৎপত্তি । এর উপর দিয়ে ছোট্ট একটা বাঁশের সাঁকো তৈরী করা আছে পর্যটকদের জন্যে । জলে পা দিতেই যেন শরীরে ছ্যাঁকা লাগলো । ওই হিমশীতল ঠান্ডা জলে কয়েক সেকেন্ডে পা অবশ হয়ে উঠলো ।
যাইহোক এতোটা পথ এসে খিদেও পেয়েছিল জব্বর । তাড়াতাড়ি স্নান করার পালা পড়লো । resort এর কর্মীদের বলাতে গরম জল এসেও গেলো তাড়াতাড়ি । কিন্তু সেই জলও তেমন প্রভাব ফেল্লোনা , কারণ নদীর জল টেনে সেটাকে ট্যাঙ্কে ভরে ব্যবহার করা হয় । এই অঞ্চলে এই নদীই একমাত্র সম্বল । স্নানের পর ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত এর সাথে ঘি , পালং শাক , ডাল , আলু ভাজা , ফুলকপির তরকারি আর মাছের ঝোল দিয়ে মধ্যাহ্নভোজন । বাঙালীর আর কী চাই ?
তারপর নদীর ধার ধরে এবড়ো খেবড়ো পথ পেরিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আমরা । এরই সাথে বৃষ্টি কিন্তু সমানে লুকোচুরি খেলে চলেছে আমাদের সাথে ।
দূষণহীন সবুজের মাঝে পাহাড়ী নদীর গর্জনের সাথে হেঁটে চলার সেই মুহূর্তগুলোকে এখনও চোখ বুঁজে বাঁচতে ইচ্ছা করে ।
সন্ধ্যা হওয়ার আগেই ফিরতে হোলো । গত দুদিন যাবৎ অনবরত বৃষ্টিতে বিদ্যুৎ সংযোগ নাকি পুরোপুরি গুলিয়ে গেছে , তাই চারিদিক জুড়ে শুধু অন্ধকার । অগত্যা লম্পর আলোয় নদীর ধরে বসে শুরু হোলো চা খাওয়া , সাথে ভেজ আর চিকেন পাকোড়া । কিছুক্ষণ পড়েই দেখি চাঁদ মামা স্বমহিমায় আমাদের দিকে তাকিয়ে । আকাশ আস্তে আস্তে পরিষ্কার হচ্ছে , তারারা ও টুকি দিচ্ছে । হয়তো আগামীকাল অন্য কোনো রূপ দেখবো আকাশের । চারিদিক চাঁদের আলোয় ভিজে , সাথে নদীর জলের নিজস্ব তালের সঙ্গে হিমেল হওয়ার ছোঁয়া । পৃথিবীতে স্বর্গের স্বাদ হয়তো একেই বলে । এরই মাঝে দেখি টর্চের আলো জ্বেলে করা যেন নদীর ওপারে কিছু একটা করছে । কাছে যেতে বুঝলাম গ্রামের কিছু ছেলে বর্শা দিয়ে নদীতে বোরোলি মাছ ধরছে । এক একজনের টিপের তারিফ করতে হবে । এদের ঠিকঠাক প্রশিক্ষণ দিলে ভবিষ্যতে খেলাধুলায় নামও করতে পারে । কিছুক্ষণ পরেই কাঞ্চার ডাক , "স্যার ডিনার লাগাদে ?" আজকের দিনটা এতটাই মনোমুগ্ধকর হোলো যে, আগামী দিনগুলো নিয়ে মনের মধ্যে আশা বাসা বাঁধতে লাগলো ।
ক্রমশ :

চোখের নোলা,
শিবাখোলা ২
কিচির মিচির এর যেন ঝড় বইছে চারিদিকে । এতো ধরনের আওয়াজ, যে বন্ধ চোখেও আলাদা করে কোনো একটাতে মনোনিবেশও করা যাচ্ছে না । পাখীদের এই ভিয়েনা সম্মেলনের মাঝেই চোখ খুললাম । ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ভোর ৫:১৫ । উঠে ঘরের দরজা খুলতেই অসাধারণ এক দৃশ্যের সম্মুখীন হলাম । সামনের পাহাড়ের মাথার পিছন দিয়ে হালকা আলো আসছে , সেই আলো বৃষ্টিস্নাত ডালপালা , পাতায় পড়ে এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি করেছে । আর সাথে সারী সারী পাখীদের আনা গোনা । এসব দেখতে দেখতে এক কাপ চাও পেয়ে গেলাম । রিসোর্ট এর কর্মীদের ব্যস্ততা দেখে , খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম আজকে নাকি রিসোর্ট এ অনেক অতিথি আসছে , তাই সব ঠিক ঠাক করতে সবাই উঠে পড়ে লেগেছে । কথায় কথায় জানতে পারলাম পিছনের পাহাড় জুড়ে বিশাল এক চা বাগান আছে । তাই সাথে সাথেই ঠিক করে ফেললাম , আমাদের আজকের গন্তব্য ।
ফুলকো লুচি দিয়ে প্রাতঃরাশ সেরে বেরিয়ে পড়লাম আমরা । বেরোনোর সময় দেখি ৩ টে বোঁচকা নাকওয়ালা মিষ্টি বাচ্চা নদীর ওপারে রং খেলছে । তাদের মধ্যে ২ জন হঠাৎ করে ল্যাংটো হয়ে জলে ঝাঁপ মারলো । শুরু হোলো খুনশুটি । বাকী একজনকে ডেকে গল্প করতে লাগলাম । ওর নাম আকাশ , পাশের গ্রামে থাকে । শিবাখোলারই INA Memorial School এ পড়ে । এমন সময় আমার বৌ এর আবির্ভাব । বাচ্চা গুলোকে রুম থেকে দেখতে পেয়ে ওদের জন্যে চকোলেট কুকিজ নিয়ে এসেছে । গোলমালটা বাঁধলো এখানে , আকাশ তো মনের আনন্দে নিজের ভাগ নিয়ে নিলো , কিন্তু বাকী দুজন তো জল থেকে উঠতে পারছেনা । বাচ্চা বলে কী সম্মান নেই ? একজন মহিলার সামনে ওই অবস্থায় জলের বাইরে আসা যায় । হাঁসতে হাঁসতে আমার বউ অন্যদিকে ঘুরলো । ব্যাস সাথে সাথে আমার হাথ থেকে কুকিজ নিয়ে আবার জলে । এখনো ভাবলে হেঁসে ফেলি 😁😁 ।
আকাশ আজ পুরো ঝকঝকে, কে বলবে গত ৩ দিন যাবৎ এক নাগাড়ে বৃষ্টি হয়ে গেছে । এবড়ো খেবড়ো পথ দিয়ে যেতে যেতে এসে দাঁড়ালাম এক চা কারখানার সামনে । হোলি উপলক্ষে ছুটি ছিলো , তাই ভেতরে আর যাওয়া হোলো না । বাইরে থেকে উঁকি মেরে দেখলাম লেখা আছে Nuborg tea estate । বড়ো গেট পেরিয়ে এবার চড়াই চড়ার পালা । যতদূর চোখ যায় , শুধু চা গাছ আর চা গাছ । পাহাড়ের ঢাল বেয়ে তার বিস্তৃতির শেষ নেই । এখানে একটা ব্যাপার লক্ষ করলাম , কিছুদূর পর পরই বোর্ড টাঙিয়ে লেখা "শিকার করা মানা" । পরে জানতে পেরেছিলাম এই চা বাগান হোলো খরগোশ আর ময়ুরের অবাধ বিচরণভূমি, যা নিজের চোখে দেখার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি । ঘন্টাখানেক ট্রেক করার পর উপরের এক পয়েন্ট এ পৌঁছালাম । ওখান থেকে চারিদিক অসাধারণ সুন্দর লাগছিলো ।
ট্রেক পর্ব শেষ করে যখন রিসোর্টে পৌঁছালাম , তখন অনেকটাই দেরি হয়ে গেছে । এবার রং খেলার পালা । জীবনে একবার পাহাড়ি নদীতে স্নান করার ইচ্ছা ছিলো । জল যতই বরফ ঠান্ডা হোক , স্বপ্ন পূরণের এই সুযোগ আর ছাড়তে পারলাম না । তাই অনেক বারণ উপেক্ষা করে আমরা নেমে পড়লাম খরস্রোতা হিম শীতল পাথুরে নদী শিবাখোলার বুকে । ঠান্ডা কাকে বলে সেই মিনিট চল্লিশেকের অভিজ্ঞতায় বুঝেছি । দুপুরের খাওয়া পর্ব শেষ করতে করতে বিকেল হয়ে গেলো । এতো ট্রেক করে ,আজ আর দূরে যাওয়ার ইচ্ছে হোলো না, তাই বিকেলটা নদীর পারে কাটিয়ে দিলাম ।
আজ আর বিদ্যুতের সমস্যা ছিলো না । গতকালের বন্য পরিবেশটার তাল একটু হলেও কাটছিলো আধুনিক আলোতে । তাই একটু দূরে গিয়েই বসলাম যাতে অন্ধকারের সাথে চাঁদনিটাও উপভোগ করতে পারি । সেদিনের সন্ধ্যাটা কাটলোও ভালো । চাঁদ , নদী , শিরশিরে হাওয়া আর বারবিকিউড চিকেন দিয়ে ।
গতকাল সন্ধ্যায় একহাত লম্বা নিকনের লেন্স ওলা ক্যামেরা নিয়ে এক ভদ্রলোক পাখীর ছবি তুলে এনে দেখাচ্ছিলেন । তখনই আমরা ঠিক করেছিলাম সকালে বেরোবো পাখী দেখতে । সেই অনুযায়ী কব্জি সমান লম্বা 😉 লেন্স নিয়ে ভোর ভোর বেরিয়ে পড়লাম পাখীর খোঁজে । প্রকৃতি আশাহত করেনি আমাদের । হাঁটতে হাঁটতে অনেক পাখী দেখলাম , ছবিও তুললাম । পাখিদের কাছে যেমন আমরা ছিলাম পরিযায়ী ,তেমন ওরাও ছিলো আমাদের কাছে অচেনা । এই জানা অজানার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে মনটা খারাপই হয়ে গেলো । রিসোর্টে ফিরেই যে শিবাখোলাকে ছেড়ে যেতে হবে । ফিরে দেখি প্রাতঃরাশ টেবিলে আর গাড়ি বাগানে অপেক্ষা করছে আমাদের জন্যে । মন না চাইলেও, রিসোর্টের মালিক , কর্মচারীদের থেকে শুভেচ্ছা নিয়ে , তাদের কে বিদায় জানাতেই হোলো ।
কোনোদিনও এই অভিজ্ঞতা ভুলবো না । আমরা সত্যি কিছু অসাধারণ মুহূর্ত পেয়েছিলাম ।
এ কদিনের আতিথেয়তায় , প্রকৃতির রূপে হয়ে উঠেছিলাম মশগুল ।
বিদায় শিবাখোলা , মোদের পরবর্তী গন্তব্য রংবুল ।